গরুর রক্ত

শেয়ার করুন:

বি পজিটিভ কি আসলেই গরুর রক্ত?

(পুরোটা পড়লে জানতে পারবেন অনেক তথ্য, সাথে দুইটা রক্তদানের ছোট্ট গল্প ফ্রি!)

প্রকৃতপক্ষে মানুষের রক্তের সাথে অন্য কোন প্রাণীর রক্ত মিলবে না। যদি মিলতো তাহলে মানুষ অন্য প্রাণীর রক্তও গ্রহণ করতো।
এটি মজা করে এই ভেবে বলা হয় কারণ বি+ খুব কমন ও সহজলভ্য তাই।

⚠️ থামুন! ফান-মজা পরে করুন! হঠাৎ প্রয়োজনের সময় এই বি+ রক্তও যোগাড় করতে হিমশিম খাবেন!

আমার পরিচিত অনেকে আছে যাদের রক্তের গ্রুপ বি+, কিন্তু তারা তো রক্তদান করে না! অনেকে করলেও নিয়মিত না। এর মানে আপনারও পরিচিত বিশাল একটা অংশ রক্তদান করেনা, অনেকে করলেও সচরাচর করে না।
আবার, যারা নিয়মিত রক্তদান করে, তারা তো করেই ফেলে। আপনি চাইলেই তো প্রতি মাসে একবার করে রক্তদান করতে পারবেন না তাইনা? অন্তত ৪ মাস (১২০ দিন) অপেক্ষা করতে হবে।
আবার এই গ্রুপের সংখ্যা বেশি মানে কিন্তু এই গ্রুপের মানুষও বেশি, রোগীও বেশি! চাহিদা বা প্রয়োজনীয়তাও বেশি। আবার শিশু, অপ্রাপ্তবয়স্ক, বৃদ্ধ, রক্তদানে অযোগ্য-অবিবেচিত এরাও তো রক্তদান করতে পারবে না!
তাহলে অর্থ কি দাঁড়ালো?
প্রয়োজনের সময় না পেলে কিংবা পেতে একটু কষ্ট হলে আপনিও মনের অজান্তে বলে বসবেন -মানুষ, মানুষ চারিদিকে এত্ত বি পজিটিভ মানুষ অথচ দেয়ার মতো কেউ নাই! (ST Coleridge!)

মনের গরু যখন বড় গরু!

সস্তা বলুন আর এভেইলেবল বলুন, এড়িয়ে না গিয়ে আপনি নিজে রক্তদান করছেন কি না সেটাই বড় কথা। সবাই যদি আপনার মতো ভাবে “এভেইলেবল তো, পেয়ে যাবে” শেষে দেখা যাবে এভাবেই রোগীটি রক্ত পাচ্ছে না!

দিনাজপুরে আমার এক ছোটভাই রক্তবন্ধু তারেক রক্তদান করতে গিয়েছিলো। রক্ত তার দেহ থেকে ব্যাগে চলমান অবস্থায় রোগীর স্বজন এসে বলেই ফেললো, ওহ! গরুর রক্ত!
অথচ তারা সারাদিন পরিচিত রক্তদাতা খুঁজে পাচ্ছিলো না!

ছবিঃ ইনবক্সে তারেক এর ম্যাসেজ (ম্যাসেঞ্জার)

ঢাকায় আমার বি+ বন্ধু সাধন বণিককে তো একবার পারলে প্রাইভেটকার ভাড়া করে দ্রুত যেতে বলেছিলো বড়লোক রোগীর লোক! আমারই পরিচিত এক ভাইয়ের কলিগ তো পারলে হেলিকপ্টারই পাঠিয়ে দেয় অবস্থা! কারণ ঐ B+ রক্তটাই দেয়ার মতো কাউকে পাচ্ছিলো না! এমার্জেন্সি!

B+ve রক্তধারীদের সংখ্যা শতকরা হিসাবের পরিসংখ্যান


  • আফ্রিকান-আমেরিকান- ১৮%

  • এশিয়ান- ২৫%
  • ককেশিয়ান -৯%
  • ল্যাটিন আমেরিকান-৯%

কারো রক্তের গ্রুপ ‘বি পজেটিভ’ (B +ve) জানার পর আমরা অনেকেই প্রায়ই হেসে বলি, তোমার তো গরুর রক্ত। আসলেই কি মানুষের দেহে গরুর রক্ত থাকে? গরুর রক্ত আর মানুষের বি পজেটিভ রক্ত কি একই? যদি তাই হয় তবে এ গ্রুপের অধিকারী কোনো ব্যক্তির রক্তের প্রয়োজন হলে গরুর দেহ থেকে রক্ত নেওয়া হয় না কেন?

মূলত পৃথিবীতে যত মেরুদণ্ডী প্রাণী রয়েছে তাদের সকলের রক্তই সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে রাসায়নিক গঠনের জন্য পার্থক্য সৃষ্টি হয়। আর তাই কোনো প্রাণীর রক্ত কখনই অন্য কোনো প্রাণীর অনুরূপ নয়।
রক্তের গ্রুপ হল রক্তের লোহিত কণিকায় অ্যান্টিজেনের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি। অ্যান্টিজেনের উপস্থিতির উপর নির্ভর করে রক্তের বিভিন্ন ধরনের গ্রুপিং সিস্টেম করা হয়েছে।
মানুষের ক্ষেত্রে ABO সিস্টেম ও Rh ফ্যাক্টর সিস্টেম পুরো পৃথিবীতে প্রচলিত। এই দুই সিস্টেম অনুযায়ী A, B, O ও AB এই চার ধরনের রক্তের গ্রুপের প্রতিটির (+) ও (-) অ্যান্টিজেন রয়েছে। অর্থাৎ, মানুষের দেহে সাধারণত এই ৮ (আট) ধরনের রক্তের উপস্থিতি পাওয়া যায়।
অপরদিকে গরুর রক্তে রয়েছে ১১টি প্রধান রক্তের গ্রুপ। এগুলো হল- A, B, C, F, J, L, M, R, S, T ও Z। এদের আবার ± আছে! তার মধ্যে কেবল B গ্রুপটিরই রয়েছে ৬০ এরও বেশি অ্যান্টিজেন। এর বাইরেও রয়েছে আরও কিছু অপ্রধান গ্রুপের রক্ত যেগুলো সচরাচর পাওয়া যায় না। অর্থাৎ গরুর রক্ত মানুষের দেহে তো দূরের কথা, এক গরুর রক্ত অন্য গরুতে সঞ্চালন করাই দূরূহ ব্যাপার।

কথা হচ্ছে, তাহলে বি পজেটিভ রক্তকে কেন গরুর রক্ত বলা হয়? আমাদের এশিয়া মহাদেশে অন্য যে কোনো গ্রুপের চাইতে B positive গ্রুপধারী মানুষের সংখ্যা বেশি। এশিয়ার প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যক্তি B+ve গ্রুপের অধিকারী। আর এই সহজলভ্যতার বিষয়টি বোঝাতে বি পজেটিভ রক্তকে গরুর রক্ত বলে অনেকেই। তাই বলে ইউরোপ বা আমেরিকায় কিন্তু বি+ রক্তের গ্রুপকে গরুর রক্ত বলা হবে না। কারণ, সেখানে কেবলমাত্র ৮.৫ শতাংশ ব্যক্তি B Positive রক্তের গ্রুপধারী। আমেরিকায় সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি সহজলভ্য (!) রক্তবহনকারী রক্তের গ্রুপ ‘এ পজিটিভ’। প্রায় ৩৫.৭% ব্যক্তি এ গ্রুপের রক্ত বহন করে।

সুতরাং সেখানে এ পজিটিভই তথাকথিত ‘গরুর রক্ত’!

 

ছবিঃ একজন স্বেচ্ছাসেবীর আর্তনাদ (ফেসবুক পোস্ট)

আসুন সহজলভ্য, গরুর রক্ত এগুলো বলে অবহেলা-অলসতা করে নিজেকে গরু প্রমাণ না করে বরং অন্যের প্রয়োজনে রক্তদানটা করেই ফেলি।

মো. তাসনিমুল বারী নবীন
প্রধান সমন্বয়ক, রক্তবন্ধু।
(মূল তথ্য গুলো ইন্টারনেটের বিভিন্ন সোর্স থেকে সংগ্রহ করা)

 


শেয়ার করুন:

Facebook Comments