দুর্লভ একটি রক্তের গ্রুপ- বোম্বে

শেয়ার করুন:

দুর্লভ রক্তের গ্রুপ

বোম্বে

খুব সংক্ষেপে সাধারণ ব্যাখ্যায় বোম্বে ব্লাড গ্রুপ সম্পর্কে ধারণা নিন।

মানুষের রক্ত দেখতে লাল বর্ণের হলেও এর গঠনগত পার্থক্য আসলে রক্তে থাকা ৩৪২টি এন্টিজেনে। এদের মধ্যে ১৬০টি এন্টিজেন সবার রক্তেই বিদ্যমান। এদের মধ্যে কোন একটি এন্টিজেন যা শতকরা ৯৯ ভাগ মানুষের শরীরে থাকে, তা না থাকলে সেটাকে “দুর্লভ” গ্রুপের রক্ত হিসেবে ধরা হয়। আর শতকরা ৯৯.৯৯ জনের শরীরে উপস্থিত থাকে এমন এন্টিজেন কারো রক্তে অনুপস্থিত থাকলে সেই রক্তের গ্রুপকে ❝খুবই দুর্লভ❞ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

আমাদের পরিচিত (ABO) ৮টি রক্তের গ্রুপে কোনো না কোনো এন্টিজেন থাকেই। রক্ত গ্রুপগুলোর নামকরণ করা হয় এন্টিজেন এবং এন্টিবডির উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির উপর নির্ভর করে। আর H এন্টিজেনকে বলা হয় Precursor এন্টিজেন। এটাকে বিল্ডিং ব্লক অব এন্টিজেনও বলা হয় কারণ সাধারণত ABO সিস্টেমে রক্তের সকল (A+, A-, B+, B-, AB+, AB-, O+, O-) গ্রুপে H এন্টিজেন উপস্থিত থাকে।
কিন্তু বিরল বোম্বে ব্লাড গ্রুপে এই কমন H এন্টিজেন থাকে না, থাকে H এর এন্টিবডি। এটা একটা বিরল ঘটনাও বটে! গ্রুপের সাথে বোম্বে গ্রুপের পার্থক্য হলো বোম্বে গ্রুপে H এন্টিজেনও থাকে না। (উপরের ছবিতে খেয়াল করুন)

N.B: এন্টিজেন এবং এন্টিবডি হলো পরস্পর প্রতিরোধী। একটি উপস্থিত থাকলে অপরটি থাকবে না। সে অনুযায়ী রক্তের অন্যান্য গ্রুপ গুলোর মতোই Rh D (রেসাস) এন্টিজেন এর উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতির ভিত্তিতে বোম্বে পজিটিভবোম্বে নেগেটিভ দুই রকমই হতে পারে। এমনিতেই তো ব্যতিক্রমী তার উপরে বোম্বে নেগেটিভ আরও দুর্লভ একটি রক্তের গ্রুপ! Bombay রক্তকে hh কিংবা Oh লেখা হয়ে থাকে। বোম্বে পজিটিভ হলে hh+ বা Oh+ আর বোম্বে নেগেটিভ হলে hh- অথবা Oh- লেখা হয়

এ পর্যন্ত পড়ে যা জেনেছেন তাই যথেষ্ট। আর না পড়লেও চলবে। তবে ভালো লাগলে, আগ্রহ জন্মালে বাকীটুকুও পড়তে পারেন।

নামকরণ ও আবিষ্কারঃ
১৯৫২ সালে ‘The Lancet’ নামক চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক গবেষণাপত্রে সর্বপ্রথম এই বোম্বে রক্তের সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয় (পৃষ্ঠা: ৯০৩-৯০৪, ৩রা মে, ১৯৫২)। গবেষণাপত্রে বোম্বে রক্তের উপর ক্ষুদ্র এই আর্টিক্যালটি লিখেছিলেন ডা. উয়াই.এম. ভেন্ডে, ডা. সি.কে. দেশপান্ডে ও ডা. এইচ. এম. ভাটিয়া। গবেষণাপত্রে বলা হয়, কোনো একদিন (ভারতে) এক রেলওয়ে কর্মকর্তা ও এক ছুরিকাহত ব্যক্তিদ্বয়ের জন্য রক্তের প্রয়োজন হলে, রক্তদাতাদের সাথে ক্রস ম্যাচিং করতে গেলে দেখা যায় যে, কারো রক্তের সাথেই মিলছে না তাদের রক্ত। গবেষণাপত্রের তিন লেখক মিলে ১৬০ জনের মতো মানুষের রক্ত পরীক্ষা করেন, অবশেষে বোম্বের একজন স্থানীয় ব্যক্তির সাথে ক্রস ম্যাচ হয় সেই রক্তের। এই রক্তকে প্রথম বোম্বেতে (বর্তমানে মুম্বাই) শনাক্ত করায় ডা. ভেন্ডে এর নাম দেন বোম্বে রক্ত। বিজ্ঞানের ভাষায় অবশ্য একে ডাকা হয় hh অথবা Oh গ্রুপের রক্ত বলে।

রক্তের গ্রুপেও ‘A এন্টিজেন’ এবং ‘B এন্টিজেন’ নেই, কিন্তু H এন্টিজেন আছে যা বোম্বে গ্রুপে থাকে না।
যাদের রক্তের গ্রুপ (হোক পজিটিভ কিংবা নেগেটিভ) তাদের সবারই একবার “বোম্বে” গ্রুপ বা hh group টেস্ট করা দরকার। তবে সুস্থ থাকতে O গ্রুপের কোন রোগীকে রক্তদান করতে গেলেও ধরা পরার একটা সম্ভাবনা  আছে। ব্যতিক্রমী এই গ্রুপ সাধারণ স্লাইডে রিএজেন্ট দিয়ে ফলাফল গ্রুপের মনে হবে। কারণ আমরা ৩ ফোঁটা রক্ত নিয়ে যে টেস্ট করি এখানে H এন্টিজেন চেক করা হয় না। ল্যাবে এডভান্স টেস্ট ছাড়া এই বিরল গ্রুপ নির্ণয় করা সম্ভব না। সাধারণ স্লাইডে আমরা যে রিএজেন্ট গুলো ব্যবহার করি তাতে এই রক্তও গ্রুপের মতো আচরণ করে। আপনি আসলেই গ্রুপের নাকি বোম্বে ব্লাড গ্রুপের তা সুনিশ্চিত না হলে হঠাৎ প্রয়োজনে না জেনে ভালোভাবে ক্রসম্যাচ ছাড়া রক্ত গ্রহণ করলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে!

বাংলাদেশে বোম্বে ব্লাড গ্রুপ প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৭৫ সালে। সোনারগাঁওতে এক অভিজাত মিয়া পরিবারে। সেখানে ডাক্তাররা দেখেন ঐ পরিবারের ১৭ জন এই বিরল ব্লাড গ্রুপের অধিকারী। তাদের রক্তগ্রহণের দরকার পড়লে ভারত থেকে রক্ত আনা লাগত। এরপর তারা আমেরিকাতে চলে যান। ১৯৯০ সালেও নারায়ণগঞ্জে এই রক্তের এক ব্যক্তিকে শনাক্ত করেছিলেন ডা. মজিবুর রহমান। পরে আরও কিছু বম্বে ব্লাড গ্রুপের সদস্য খুঁজে পাওয়া যায়।  ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসসহ অন্যান্য সোর্স এর তথ্য অনুযায়ী ইউরোপে প্রতি লাখে একজন এবং ভারতে প্রতি ১০ হাজারে এক জন এই রক্তের বাহক। তাহলে বুঝুন কত রেয়ার এই ব্লাড টাইপ।

কিভাবে সনাক্ত করে এই ব্লাড টাইপ ?

আগেও বলেছি সাধারণ ম্যাচিং পরীক্ষায় এই ব্লাড টাইপ আচরণ করে O ব্লাড গ্রুপের মত, কিন্তু যখনই ক্রস ম্যাচিং এ দেওয়া হয় তখন এই ব্লাড টাইপ সব এন্টিজেন (A,B,H) এর সাথে বিক্রিয়া করে এবং জমাট বেঁধে যায়।
Anti H antisera (ব্যয়বহুল) রিএজেন্ট দিয়ে এটা নির্ণয় করা যায়। Sera Grouping/রিভার্স গ্রুপিং মেথডের মাধ্যমেও বোম্বে সনাক্ত করা সম্ভব।

মোটকথা, সাধারণ সেল গ্রুপিং করলে “ও” ব্লাড গ্রুপের মতো দেখায়। সিরাম গ্রুপিং করলে তখন বোম্বে সন্দেহ হয়। এরপর এন্টি এইচ দিয়ে কনফার্ম করা হয়। সেজন্য সেল এবং সিরাম গ্রুপিং ভীষণ জরুরি। তাতে ভুলের সম্ভাবনা কম। এভাবেই এই বোম্বে ব্লাড টাইপ সনাক্ত হয়।

যিনি বোম্বে তাকে যদি “ও” ভেবে ব্লাড ট্রান্সফিউশন করা হয় তাহলে হিমোলাইটিক ট্রান্সফিউশন হয়ে রোগি মারা যেতে পারেন।

বংশলতিকার মাধ্যমে একেকজনের রক্তের গ্রুপ তৈরি হয়। লোহিত কণিকার কাঠামোতে H এন্টিজেন থাকে। এই এন্টিজেনের সাথে প্রাপ্ত A, B, AB যুক্ত হলে সেই ব্যক্তির রক্তের গ্রুপে সেটা প্রকাশ পায়। আর A, B, AB এদের কোনোটিই এন্টিজেন হিসেবে যুক্ত না হলে তখন সেটা O গ্রুপ। এভাবেই রক্তের গ্রুপ গুলোর নামকরণ করা হয়। (প্রথম চিত্রটি আবার লক্ষ্য করুন) বোম্বে ব্লাড গ্রুপে এই H এন্টিজেন অনুপস্থিত থাকে। ফলে কোনো এন্টিজেন প্রকাশিত হয় না তাই গ্রুপিংয়ের সময় সেল গ্রুপিংয়ে O গ্রুপের মতন দেখায়।
সিরাম গ্রুপিংয়ের সময় এটা ধরা পড়ে।
এরা hh অর্থাৎ বোম্বে।

পরিবার থেকে আসে বলে একই পরিবারের কারো কারো শরীরে বোম্বে গ্রুপের রক্ত থাকে।
বোম্বে ব্লাড ট্রান্সফিউশন কেবলমাত্র বোম্বে দিয়েই করতে হয়।
যেহেতু আমরা যারা সাধারণ স্বেচ্ছাসেবী রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ও রক্তদান নিয়ে কাজ করি ব্যাপারটা আমাদের জন্য জটিল ও কঠিন এবং এই রক্তের রোগী সচরাচর পাওয়াও যায় না, তাই বোম্বে নির্ণয় নিয়ে দুশ্চিন্তা না করলেও চলবে!রক্তবন্ধু

Happy learning and stay connected with Roktobondhu!

তথ্য সংগ্রহ ও লেখা
মোঃ তাসনিমুল বারী নবীন

Revised by-
ডা. ফারহানা ইসলাম নীলা

ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল
মহাখালী, ঢাকা
ডিএমসি কে -৪১

Graphics: মির্জা অরণ্য 

বাংলাদেশে যেভাবে আলোচিত হয় বোম্বে রক্ত পড়ুন….. 


শেয়ার করুন:

Facebook Comments